১। অনেক বছর আগের কথা। তখন আমার বাবার জন্ম হয়নি। তিনি তখন আমার ঠাকুমার গর্ভে। আমাদের এলাকা নাকি তখন মেছো পেতনির জন্য খুব কুখ্যাত ছিলো। এরা নাকি রাতের অন্ধকারে মানুষকে একা পেলে যদি তার কাছে মাছ থাকতো তখন মানুষকে ভয় দেখিয়ে মাছ কেড়ে খেতো। তো ঠিক সেরকমই এক রাতের ঘটনা। আমার ঠাকুমার বাবা আর্থাৎ আমার বড় বাবা। মেয়ে গর্ভবতী থাকার কারনে মেয়েকে দেখতে আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন। যেহেতু আমার ঠাকুমায়ের তখন ভরা মাস ছিলো তাই তিনি যে গর্ভবতী তা তাকে দেখলেই বোঝা যেতো। সেদিন রাতে ঠাম্মার বাবা রাতে বাথরুমে যাওয়ার জন্য বাইরে বের হলেন। এখানে বলে রাখি পেত্নিদের নাকি পেট প্রচুর বড় ছিলো। তো সে বাইরে গিয়ে অন্ধকারে দেখছেন কারন যেহেতু তখন কারেন্টন এর ব্যাবস্থা ছিলো না। তিনি দেখলেন বাগনের মধ্যে আমার ঠাম্মি দৌড়ে গিয়ে কাঠাল গাছ বেয়ে উপরে উঠে যাচ্ছেন। সেটা দেখে তিনি তো রিতিমত অবাক। কারন একজন গর্ভবতী মহিলার পক্ষে এই অবস্থায় কি করে শুধুমাত্র দৌড়ে ওতো বড় একটা কাঠাল গাছে উঠে যাওয়া সম্ভব। তিনি পিছন পিছন দৌড় দিলেন সেটা দেখে এবং বারবার বলছে তুই এটা কি করছিস? তোর কি মাথা খারাপ? এই অবস্থায় এটা কি করে করছিস পড়ে গেলে আর রক্ষা থাকবে না। নেমে আয় তাড়াতাড়ি। তো এই চিৎকার চেচামেচি শুনে বাড়ির ভেতর থেকে সবাই বাইরে বেরিয়ে এলে তিনি দেখলেন যে সবার সাথে সাথে আমার ঠম্মাও ঘর থেকে বের হয়েছেন। তিনি তো অবাক। সবাইকে সবকিছু খুলে বলতেই কারোর আর বুঝতে বাকি রইলো না যে এটা কার কাজ।
২। আমার ছোট পিসির বিয়ে হয়েছিল একাত্তরের পরে। তো তখন যেমন ছিলো পায়ে চলা পথ। আর এতো উন্নত রাস্তাঘাট ও ছিলো না। তাই মাঠের মধ্যে থেকে যেতে হতো। আর আমরা সবাই হয়তো জানি যে সদ্য নতুন বিবাহিত মেয়েদের প্রতি দুরাত্মাদের নজর থাকে প্রচুর। তাই সবসময়ই সঙ্গে সঙ্গে একজন লোক থাকতে হয়। কিন্তু পিসিকে যখন বিয়ের পর শশুরবাড়ি নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো সেই রাতের বেলায়। তখন মাঠে সেই তালগাছের নিচে গিয়ে তাকে খারাপ কিছু ধরেছিল। কারন কোনও কারনে তার সাথে থাকা লোকের হাত ছেড়েছিলেন তিনি। এরপরই শুরু হয় পিসির নানান ভুল বকা। সবাইকে কামাড়াতে যেতো মারতে যেতো। এমনকি প্রচুর গালি গালাজও করতেন। তাই ওঝা ডাকার ব্যাবস্থা করা হলো। তখন ওঝা ঝাড়িয়ে তার গায়ে নতুন কাপড় চাপা দায়ে বারবার ধুপের ছিটা মারছিলো আর বলছিলো কেনো ধরেছিস ওকে ছেড়ে দে নয়তো দুঃখ আছে তোর। কিন্তু সেও নাছোড়বান্দা সে কিছুতেই পিসির শরীর ছেড়ে যেতে নারাজ। এমনি পিসি তখন রাগে আমার বড় পিসাকে কামড়ে ধরেছিলেন। পরে অনে কাটখড় পুড়িয়ে তাকে বিদায় করা সম্ভব হয়েছিলো। সেই থেকে আমার পিসি কানে অনেক কম শোনে। তাকে একটা কথা বারবার বললে তবে গিয়ে শুনতে পায় তাও আবার অনেক জোরে।
৩.আমার বাবার কাকাদাদু ছিলেন প্রচুর সাহসী। তিনি রোজ রাতে নৌকা করে বাজারে যেতেন ব্যাবসা করে অনেক রাতে ফিরতেন নৌকায়। এবং মাছ কিনে নিয়ে আসতেন। সেরকমই একদিন তিনি ফিরছিলেন। তখন তিনি শুনতে পান তার নাম ধরে কেউ ডাকছে আর বলছে নৌকাটা পারে ভিড়া। পাশের জঙ্গল থেকে এমন আওজায় আসছিল বারবার। কিন্তু তিনি যেহেতু সাহসী তাই এসবে পাত্তা না দিয়ে বললো ভিড়াবো না কি করবি তুই? তখন সেইটা বলে ভালো ভাবে বলছি ভিড়া নয়তো মরন আছে কপালে তোর। তখন দাদু বলেন সে তখন দেখা যাবে মেলা ফ্যাচফ্যাচ করিস না দূর হ।
তখন সেটা পিছন থেকে বলতে থাকে ভালো করলি না তুই। এর ফল তুই পাবি। আজকের মতো ছাড়লাম কিন্তু তোকে একদিন ধরবো কায়দা মতো দেখিস তুই। তখন সে বলতে বলতে আসে ঠিকাছে আসিস তুই। এরপর একদিন রাতে তিনি হেটে হেটে বাড়ি আসছিলেন তখনই সেটা তার পথ আকড়ে দাঁড়ায়। সেটা নাকি দৈত্য আকৃতির কিছু। এসে দাদুকে বলে কিরে খুব তো সাহস দেখিয়েছিলি সেদিন। আজ তোর প্রতিশোধ নেবো। আমাকে না করা তোর আজ হবে। বলেই সেটা তার উপর ঝাপিয়ে পরে। কিন্তু সেই দাদু যেমন ছিলেন সাহসী তেমনি ছিলেন শক্তিশালী ও। তিনিও সমান আকাড়ে ধরলেন সেটাকে পরে মাটি দুইজন হাতাহাতি জড়াজড়ি করছিলো। আর মাটি ছিলো অসংখ্য কাটাঝাড়। কাটা গাছ যেটাকে বলি আমরা গাছে ছোট ছোট কাটা থাকে লেবু গাছের মতো আরকি। তার উপরে দাদুকে ফেলে ধস্তাধস্তি করতে থাকে তার সারা গা রক্তাক্ত করে দেয়। তিনিও তেমনি ছাড়বার পাত্র নন। তখন রাতে সেই ধস্তাধস্তির শব্দ শুনে সামনে কিছু মুসলিম বাড়ি ছিলো সেখান থেকে লোকেরা মশাল নিয়ে বেরিয়ে আসে এবং এসে দেখে এই অবস্থা। তারা তখন তাকে ধরে বাড়ি পৌছে দিয়ে যায়। তারপর দাদু কিছুদিন প্রচন্ড জ্বরে ভোগেন ও তার দু চারদিন পর মারা যান।
৪. আমাদের পরিবারেরই কেউ একটা ছিলো সে আর তার এক বন্ধু ঠিক করে ভোরে মাটি কাটতে যাবে। কিন্তু তখন যেহেতু ঘড়ি ছিলো না। তাই ভোররাতে বোঝা যেতো না। তিনি মাঝরাতে শুনতে পান তার বন্ধু তাকে ডাকছে। শুনে তিনি ভোর হয়ে গেছে ভেবে উঠে আসেন খোন্তা নিয়ে মাটি কাটার উদ্দেশ্যে। এখানে একটা কথা ক্লিয়ার করি। আমি যেহেতু সনাতন ধর্মের। আ র প্রত্যেকটা ঘটনা আমার ফেমেলীর। তাই আমাদের মধ্যে ভুত প্রেত তাড়ানোর জন্য আমরা রাম নাম স্মরন করি এতে ভুত চলে যায় ওরা ভয় পায়। এটা কেনো বললাম তা গল্পের খাতিরে বুঝতে পারবেন শেষের দিকে। তো যাই হোক। তো তারা যখন মাটি কাটছে তো দেখছে সেই বন্ধু অনেক দ্রুত কাজ করছে নিমেষে মাটি কেটে ফেলছে। একটা মানুষের পক্ষে এতো দ্রুত কাজ করা সম্ভব নয়। তার কিছুটা সন্দেহ হলেও সে কিছু না বলে হাত দিয়ে মাটি সরাতে থাকে। তো এক পর্যায়ে কিছু মাটি ছিটে তার মুখের মধ্যে চলে যায়। আর সে বলে ওঠে এ রাম মাটি চলে গেলো মুখে। সেটা বলার সাথে সাথেই দেখে সেই বন্ধু কোথাও নেই একটা কাক মরে পরে আছে। তার আর বুঝতে বাকি রইলো না যে কি হতে চলেছিল আজ তার সাথে।
৫. একদিন রাতে আমার ঠাম্মা পিঠা ভাজছিলেন। হঠাত একটা হাত রান্নাঘরের মধ্যে পেতে দিয়ে কেউ বলে আমায় একটা পিঠা দে না। আমার ঠাকুরমার বুঝতে বাকি নেই যে কে পিঠা চাচ্চে। তিনি বললেন দিচ্ছি হা কর বলেই সে খুন্তি চুলোর মধ্যে দিয়ে আচ দিতে থাকেন আর বের খুন্তি বাইরে বের করে বলেন হা কর। আর সেটা ওটার মুখে ঢুকিয়ে দেয়। পরেরদিন দেখে উঠোনে একটা কাক মরে পরে আছে।
৬.আমার ঠাকুরমা মারা যাওয়ার পরে আমার বড় মা কিছু ঘটনার সম্মুখিন হয়। একদিন রাতে বড় মা ঘুমিয়ে আছে তিনি শুনতে পান আমার ঠাকুমা ডাকছে তাকে। বড়মার নাম ধরে। দু বারের বেশি আর একবারেও ডাকতো না কখনও। সে ডাক শুনে প্রায়াই ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেন। বড় খাল ছিলো আমাদের বাড়িতে সেই খাল দিয়ে নৌকা করে সবাই যাতায়াত করতেন। বড়মা দেখতেন ঠাকুমা সেখানে দাড়িয়ে আছেন। পরে জেঠু গিয়ে কাউকে দেখতেন না জোর করে বড়মাকে ঘরে নিয়ে আসত। সে কিছুতেই আসতে চাইতেন না শুধু বলতেন মা আমায় ডাকছে।
আর আমার ঠাকমা অসুস্থ থাকা কালীন প্রায় রাতেই আমার ঠাকুরদার নৌকাটা ঘাটে বাধা দেখা যেতো। তিনে ঠাম্মার আগে মার গেছিলেন। কিন্তু যখন ঠাম্মা অসুস্থ হলেন হাসপাতালে ভর্তি বড়মা প্রায়ই রাতেই শুনতে বাইরে থেকে গোঙানির আওয়াজ আমার ঠাকুরদার কন্ঠে। ঠাম্মাও মারা গেলো গোঙানির আওয়াজ ও বন্ধ হলো আর সেই নৌকা দেখাও বন্ধ হলো। ধারনা করা হয় দাদুই নৌকা নিয়ে ঠাম্মাকে নিতে আসতেন।
৭. আমার মা আমি ছোট থাকতেই মারা যায় ক্যান্সারে। মা মারা যাওয়ার পর দিদিমা দেখতেন স্বপ্নে মা দিদিমায পাশে এসে খাটে বসতেন তার মাথায় বিশাল একটা খোপা বাধা।
৮. আমার দিদাবাড়িতে একটা কামিনী ফুল গাছ ছিলো সেখানে নাকি একটা পরী থাকতো কোলে একটা বাচ্চা নিয়ে। সেই পরীকে বাড়ির সবাই দেখতেও পেতো। ভীষন সুন্দর দেখতে। আর সে যখন আসতো খুব সুন্দর ফুলের গন্ধে সারা বাড়ি ম ম করতো। সেই ফুলগাছ টা একদিন কাটা হলো আর সেদিন থেকে পরীটা আসাও বন্ধ করে দিলো।
গল্পঃ অদৃশ্যত্ব
লেখকঃ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক
অপার্থিবঃ ১২৯
#Aparthibo
#MymensinghShortStories
Join is on messenger: https://m.me/j/AbaOm2llX93W0VYz/
- কমেন্টে জানাতে ভুলবেন না, কেমন লেগেছে আজকের গল্প।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন